সারাদেশ

সংশোধন কেন্দ্রের পরিবর্তে শিশুরা যাচ্ছে কারাগারে

ছেলেটির নাম মামুনুর রশিদ। জন্ম নিবন্ধন সনদ অনুযায়ী তার বয়স ১৫ বছর। গত ২৫ সেপ্টেম্বর সিএমপির কোতোয়ালি থানায় মানব পাচার আইনে দায়ের হওয়া একটি মামলার এজাহারভুক্ত আসামি সে। মামলার এজাহারে তার বয়স দেখানো হয়েছে ২০ বছর। এজাহার অনুযায়ী মামুনের বিরুদ্ধে অভিযোগ, সে ১১ বছরের একটি শিশুকে মিথ্যা প্রলোভন দেখিয়ে ‘মানব পাচার অপরাধ সংঘটনের উদ্দেশ্যে অপহরণসহ আটক’ রেখেছিল। ওই মামলায় গত প্রায় দেড় মাস ধরে চট্টগ্রাম কারাগারে আটক রয়েছে মামুন। নানা আইনি জটিলতার কারণে এখনও মামুন কারাগার থেকে মুক্তি পায়নি। এর আগে গত বছরের ডিসেম্বর মাসে সোহেল নামে ১২ বছরের এক শিশুকে এমন ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছিল। জমির সীমানা নিয়ে বিরোধের একটি মামলায় ১৯ বছর বয়স দেখিয়ে সোহেলকে আসামি করা হয়েছিল। মামলায় জড়িয়ে পড়ার কারণে সে গত বছর স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেনি।

চট্টগ্রামে মামুন ও সোহেলের মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়া অনেক শিশুকে এভাবে গ্রেফতার হয়ে কারাভোগ করতে হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের দায়িত্বহীনতা ও উদাসীনতাই এর জন্য দায়ী বলে চট্টগ্রামের একাধিক সিনিয়র আইনজীবী ইত্তেফাককে জানিয়েছেন। তারা বলেন, মূলত প্রতিপক্ষকে নাজেহাল করার জন্য মামলায় প্রাপ্তবয়স্কদের পাশাপাশি শিশুদেরকে আসামি করা হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মামলা গ্রহণের আগে পুলিশ শিশু অপরাধীর বয়স যাচাই করে না। মামলার ফরোয়ার্ডিংয়ে পুলিশ বেশি বয়স দেখিয়ে গ্রেফতার শিশুকে দাগী আসামি হিসেবে আদালতে পাঠায়। থানা থেকে শিশুদের আদালতে প্রেরণের পর অনেক সময় কোর্ট হাজত থেকে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে উপস্থাপন করা হয় না। আদালতে উপস্থাপিত নথিতে উল্লেখিত বয়স দেখেই বিচারক শিশুকে জেলহাজতে প্রেরণের আদেশ দেন। যার কারণে প্রকৃত বয়স নির্ধারিত না হয়ে শুধু এজাহার বা ফরোয়ার্ডিংয়ের ওপর ভিত্তি করেই শিশুকে জেলখানায় প্রেরণ করা হয়। জেলখানায় প্রেরণের পর জেল কর্তৃপক্ষ কর্তৃক বয়স নির্ধারণের পর এজাহার ও পুলিশ ফরোয়ার্ডিংয়ে উল্লিখিত বয়সের সঙ্গে জেল কর্তৃপক্ষের প্রদত্ত বয়সের যথেষ্ট পার্থক্য ধরা পড়ে। এরপর আইনি জটিলতার কারণে ওই শিশুকে কারাগার থেকে সংশোধন কেন্দ্রে প্রেরণের ক্ষেত্রে প্রায়ই দীর্ঘসূত্রতার সৃষ্টি হয়। অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়া শিশু, কিশোর ও কিশোরীদের মধ্যে অনেককেই বড় ধরনের সাজাপ্রাপ্ত হয়ে কারাভোগ করতে দেখা যায়। অথচ প্রচলিত আইন অনুযায়ী তাদের থাকার কথা ছিল সংশোধন কেন্দ্রে। ২০১৩ সালের শিশু আইনের ৫২ ধারা অনুযায়ী, কোনো আমলযোগ্য অপরাধের অভিযোগে ১২-১৮ বছর বয়সী কোনো শিশুকে গ্রেফতার করা হলে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিজেই তাকে জামিন দিতে পারেন। কিন্তু সাধারণত তারা জামিন দিতে চান না বলেই অভিযোগ রয়েছে।

মানবাধিকার আইনজীবী অ্যাডভোকেট জিয়া হাবীব আহসান ইত্তেফাককে বলেন, শিশুকে প্রাপ্ত বয়স্ক হিসেবে দেখিয়ে মামলায় ফাঁসানোর ঘটনা চট্টগ্রামে অহরহ ঘটছে। এটি শিশু আইনের চরম লংঘন। এজন্য মামলার বাদীপক্ষ, পুলিশ থেকে শুরু করে বিচার প্রক্রিয়ায় জড়িত সকলেরই দায়দায়িত্ব রয়েছে। দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের দায়িত্বহীনতার কারণে একটি শিশুকে সাধারণ আসামির মতই বিচার প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হয়। কারাগারে তাকে রাখা হয় প্রাপ্ত বয়স্ক দাগী আসামিদের সঙ্গে। সেখানে শিশুটি নানাভাবে নির্যাতিত হয়। ধীরে ধীরে একসময় সে নিজেও অপরাধী হয়ে পড়ে। জিয়া হাবীব আহসান আরো বলেন, শিশু, কিশোর ও কিশোরীদের সংশোধনাগার উন্নয়ন কেন্দ্রে রেখে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। তাদের প্রবেশন, প্রবেট, প্যারোলসহ গুডটাইম ‘ল এর সকল সুবিধা দিতে হবে। দয়া, ক্ষমতা, অনুকম্পা, সহানুভূতির দৃষ্টিতে তাদের জীবনমান উন্নয়নে সহযোগিতা দিতে হবে। অন্যথায় মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘনসহ আইনের সুশাসন প্রতিষ্ঠা বাধাগ্রস্ত হবে। চট্টগ্রাম অতিরিক্ত মহানগর পিপি ও শিশু আদালতের পিপি অ্যাডভোকেট এমএ ফয়েজ বলেন, প্রধান দায়িত্বটা আসলে একজন পুলিশ কর্মকর্তার। আসামির বয়স নিশ্চিত হওয়ার জন্য তিনি গ্রেফতারকৃত শিশুর অভিভাবককে অনুরোধ করতে পারেন। পুলিশ ফরোয়ার্ডিংয়ে আসামিকে শিশু হিসেবে উল্লেখ করা হলে আদালতের কাজ সহজ হয়ে যায়।