সারাদেশ

অগ্নিকাণ্ডে নিহত তিন বোন!

যাদের পদচারণায় মুখরিত ছিল স্কুলের মাঠ, তাদের আর কোনদিন পাবে না তাদের সহপাঠীরা। মেধাবী শিক্ষার্থীদের হারিয়ে যেন নির্বাক স্কুলের শিক্ষকরাও। জেলা শহরের আরামনগর এলাকায় বুধবার রাতের বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিটে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় একই পরিবারের নিহত হওয়া ৮ জনের মধ্যে ছিল বৃষ্টি, হাসি ও খুশি। বৃষ্টি আকতার ছিল এবারের জেএসসি পরিক্ষার্থী।

প্রথম দিনের বাংলা পরীক্ষায় অংশগ্রহন করলেও পরের পরীক্ষায় অংশগ্রহনের সুযোগ আর হলো না।

জেএসসিতে জিপিএ-৫ কে কে পাবে শিক্ষকের এমন প্রশ্নের উত্তরে অন্যান্য সহপাঠীদের সঙ্গে মেধাবী শিক্ষার্থী বৃষ্টিও হাত উঁচু করেছিল বলে জানান সদর থানা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো: আবুল বাশার। স্কুলের খেলাধুলা, স্কাউটিং, গান, আবৃত্তিসহ নানা বিষয়ে পুরস্কার লাভ করে বৃষ্টি জানান তিনি।

অপর জমজ দুই বোন হাসি ও খুশি পড়তো পাশের কালেক্টরেট বালিকা বিদ্যা নিকেতনের ৭ম শ্রেণিতে। তারাও খেলাধুলা, নাচ গান ও স্কাউটিংয়ের সঙ্গে জড়িত ছিল বলে জানান প্রধান শিক্ষক মো মাহবুব উল আলম।

‘বৃষ্টি, হাসি ও খুশিকে কোনদিনই দেখতে পাব না ভাবতে অবাক লাগছে’ জানালো সহপাঠী রুমা খাতুন, ফাতেমা খাতুন ও ফিরোজা বেগম। মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় বৃহষ্পতিবার স্কুল দুটি ছুটি ঘোষণা করেছিল।

প্রতিবেশী মুরাদ হোসেন জানান, ২৫/৩০ বছর আগে নীলফামারীর ডোমার থেকে কাজের সন্ধানে জয়পুরহাটে আসেন দুলাল হোসেন ও মোমেনা খাতুন। দীর্ঘদিন ভাড়া বাড়িতে থাকলেও বছর তিনেক আগে জেলা শহরের আরামনগর এলাকায় তিন শতাংশ জমি কিনে একটি সেমি পাকা বাড়ি করেন। একমাত্র আব্দুল মোমিনকে বিয়ে দেন পরিনা খাতুনের সঙ্গে। মোমিন ও পরিনা খাতুনের সংসারে প্রথম সন্তান বৃষ্টি। এরপর জমজ হাসি, খুশি। তারপর অনেক আশা আকাংক্ষার শিশু পুত্র নূরের জন্ম। যার বয়স দেড় বছর। দুলাল ও মোমেনা ধানের গুড়া কেনা বেচা করলেও মোমিন মুরগীর ব্যবসা করতেন। এখন তাদের সুখের সংসার।

বুধবার রাতে বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে আগুন লেগে তিন কক্ষের পুরো বাড়ি পুড়ে যায়। এ ঘটনায় পরিবারের সকলেই নিহত হন। প্রতিবেশীদের নিকট এখন যেন শুধুই স্মৃতি দুলালের পরিবার। শুক্রবারেও অনেকে আসেন পুড়ে যাওয়া বাড়িটি দেখা ও ঘটনা শোনার জন্য। দূর সম্পর্কের আত্মীয়স্বজনরা আসেন। তাদের কান্নায় আকাশ বাতাস ভারি হয়ে ওঠে আরামনগর এলাকার। দূর সম্পর্কের ছোট ভাই ফারুক ও ভাতিজা লিটন এসেছেন ডোমার থেকে।

অগ্নিকাণ্ডের সময় ঘটনাস্থলে নিহত হন মা মোমেনা খাতুন (৬৫), ছেলে আব্দুল মোমিন (৩৫) ও মোমিনের মেয়ে বৃষ্টি (১৪)। গুরুতর আহত ৫ জনকে জেলা আধুনিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এখানে অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ণ ইউনিটে নেওয়া হচ্ছিল। পথে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন বাবা দুলাল হোসেন (৬৫), ছেলে মোমিনের স্ত্রী পরিনা খাতুন (৩২), মোমিনের মেয়ে হাসি (১৩), খুশি (১৩) ও দেড় বছরের শিশু পুত্র নূর।

আগুনে পুড়ে ৮ জনের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় শুক্রবার জেলার কেন্দ্রিয় মসজিদ, পাঁচু মসজিদ, চিনিকল মসজিদ, আরামনগর মসজিদসহ বিভিন্ন মসজিদে বিশেষ মোনাজাত করা হয়।

অগ্নিকাণ্ড ও মর্মান্তিকভাবে একই পরিবারের ৮ জনের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদঘাটন করতে গঠিত পৃথক তিনটি তদন্ত কমিটি বৃহষ্পতিবার থেকেই কাজ শুরু করেছেন বলে জানান অতিরিক্ত পুলিশ সুপার উজ্জল কুমার রায়। এই মর্মার্ন্তিক মৃত্যুর ঘটনায় জেলা জুড়ে শোকের ছায়া নেমে আসে।