জাতীয়প্রধান সংবাদ

জাতিসংঘে মিয়ানমারের অসহযোগিতার কথা জানালেন প্রধানমন্ত্রী

রোহিঙ্গা সঙ্কটের শান্তিপূর্ণ সমাধানে মিয়ানমারের ওপর চাপ প্রয়োগের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণসহ মিয়ানমার সরকারের নিষ্ক্রিয়তার কথা জাতিসংঘে তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

বাংলাদেশ সময় শুক্রবার সকালে জাতিসংঘের ৭৩তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।

বক্তব্যের শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘের ৭৩ বছরের ইতিহাসে চতুর্থ নারী হিসেবে সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ায় মারিয়া ফের্নান্দা এসপিনোসা গার্সেসকে অভিনন্দন জানান।

জাতিসংঘ মহাসচিবের অঙ্গীকার সুরক্ষায় বাংলাদেশের আকুণ্ঠ সহযোগিতা থাকবে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী। একইসঙ্গে বিশ্ব শান্তি, নিরাপত্তা ও টেকসই উন্নয়ন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সাহসী ও দৃঢ় নেতৃত্ব প্রদানের জন্য জাতিসংঘের মহাসচিবকে অভিবাদন জানান শেখ হাসিনা।

বাংলা ভাষায় টানা দশমবার জাতিসংঘে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যে বাংলাদেশকে বলা হতো দুর্যোগ, বন্যা-খরা-হাড্ডিসার মানুষের দেশ, তা এখন বিশ্বশান্তি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, নারীর ক্ষমতায়ন ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে বিশ্বে চমক সৃষ্টি করেছে।

শেখ হাসিনা বলেন, বিভিন্ন সূচকে বাংলাদেশ তার দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশিদের ছাপিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু আমাদের পথচলা এখনও শেষ হয়নি। এ পথচলা ততদিন চলবে যতদিন না আমরা আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ক্ষুধা, দারিদ্র্য, নিরক্ষরতা এবং শোষণমুক্ত সোনার বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে পারবো।

দ্রুত রোহিঙ্গা সঙ্কটের শান্তিপূর্ণ সমাধান চেয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতিসংঘের সঙ্গে মিয়ানমারের যে চুক্তি হয়েছে, তার বাস্তবায়ন ও কার্যকারিতা দেখতে চাই। এ জাতীয় ঘটনাকে অগ্রাহ্য করে শান্তিপূর্ণ, ন্যায্য ও টেকসই সমাজ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তচ্যুত ও অসহায় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর দুর্দশার স্থায়ী ও শান্তিপূর্ণ সমাধানে গত বছর সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে আমি পাঁচ-দফা প্রস্তাব পেশ করেছিলাম। আমরা আশাহত হয়েছি-কেননা আমাদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও আজ পর্যন্ত মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের স্থায়ী ও টেকসই প্রত্যাবাসন শুরু করা সম্ভব হয়নি।

মিয়ানমারকে প্রতিবেশী দেশ উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রথম থেকেই আমরা তাদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে রোহিঙ্গা সমস্যার একটা শান্তিপূর্ণ সমাধানের চেষ্টা করে যাচ্ছি। ইতোমধ্যে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে একাধিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। তবে মিয়ানমার মৌখিকভাবে সব সময়ই রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেবে বলে অঙ্গীকার করলেও বাস্তবে তারা কোনো কার্যকর ভূমিকা নিচ্ছে না।

গত কয়েক দশক ধরে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের উপর জাতিগত নিপীড়ন চালিয়ে আসছে দেশটির সরকার। জীবন বাঁচাতে বিভিন্ন সময়ে সেখান থেকে পালিয়ে এসে পাঁচ লাখের বেশি মানুষ বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়ে আছেন।

২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে পুলিশ চেকপোস্টে হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে সেনা অভিযানের নামে রোহিঙ্গা নিধন শুরু করে মিয়ানমার। দেশটির সেনাবাহিনী নির্যাতনের মুখে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া শুরু করেন রোহিঙ্গারা। জাতিসংঘের তথ্যমতে, গত এক বছরে বাংলাদেশে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের জন্য আমরা সাধ্যমত খাদ্য, বস্ত্র, চিকিৎসা, নিরাপত্তা, শিশুদের যত্নের ব্যবস্থা করেছি। এ কাজে জাতিসংঘ, কমনওয়েলথ, ওআইসিসহ বিভিন্ন সংস্থা ও দেশ সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়ায় কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন শেখ হাসিনা।

তিনি বলেন, রোহিঙ্গারা যতদিন তাদের দেশে ফেরত যেতে না পারছে, ততদিন তাদের জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ সকল ধরনের সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা রেখে নতুন আবাসন নির্মাণের কাজে সরকার হাত দিয়েছে।

তিনবারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজের ১৫তম ভাষণে তার পিতার স্মৃতিচারণ করে বলেন, ৪৪ বছর আগে এই মঞ্চে দাঁড়িয়ে আমার বাবা, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন- মানবজাতির অস্তিত্ব রক্ষার জন্য শান্তি একান্ত দরকার। এই শান্তির মধ্যে সারা বিশ্বের সকল নর-নারীর গভীর আশা-আকাঙ্ক্ষা মূর্ত হয়ে রয়েছে। এই দুঃখ-দুর্দশা-সংঘাতপূর্ণ বিশ্বে জাতিসংঘ মানুষের ভবিষ্যত আশা-আকাঙ্ক্ষার কেন্দ্রস্থল।

শেখ হাসিনা বলেন, আমার বাবা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের জনগণের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্য আজীবন সংগ্রাম করেছেন। দীর্ঘ ২৪ বছরের সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ী হয়ে তার নেতৃত্বে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করে ১৯৭১ সালে। এই দীর্ঘ সংগ্রামে প্রায় ১৪ বছরই তিনি কারাগারে বন্দি জীবন কাটিয়েছেন। তাকে হত্যার ষড়যন্ত্র হয়েছিল বারবার।

রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমারের নির্যাতনের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতিসংঘের প্রতিবেদনে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনের যে চিত্র ওঠে এসেছে, তাতে আমরা হতভম্ব। আমরা আশা করি, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বিশেষ করে জাতিসংঘ রোহিঙ্গাদের ওপর ঘটে যাওয়া এ অত্যাচার ও অবিচারের বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখবে।