জাতীয়ব্যবসা-বানিজ্য

দুদক বাচ্চুসহ ১৩ পরিচালককে মুখোমুখি করবে

বেসিক ব্যাংকের সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনায় সাবেক চেয়ারম্যান শেখ আবদুল হাই বাচ্চুসহ পর্ষদের সব সদস্যকে এক টেবিলে বসিয়ে মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদ করতে যাচ্ছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এরই মধ্যে ওই সময়ের পরিচালনা পর্ষদের ১৩ পরিচালককে ব্যক্তি পর্যায়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। এখন সবাইকে একসঙ্গে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে অর্থ আত্মসাতে সাবেক পর্ষদের ভূমিকা ও দায় নিয়ে প্রতিবেদন পেশ করা হবে কমিশনে। এতে করে বহুল আলোচিত বিশাল এই দুর্নীতির নেপথ্যের খলনায়কদের চেহারা উন্মোচিত হবে বলে আশা করছেন সংশ্নিষ্টরা।

২০০৯-২০১৪ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত বাচ্চুর নেতৃত্বাধীন পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা (পরিচালক) বিপুল অঙ্কের এই অর্থ আত্মসাতের দায়ে অভিযুক্ত। তবে এখনও এই কেলেঙ্কারির কোনো সুরাহা হয়নি। চার হাজারের মধ্যে দুই হাজার কোটি টাকা আত্মসাতে করা ৫৬টি মামলা তদন্তের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে দুদক। বাকি প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের বিষয়ে এখনও অনুসন্ধানই শুরু হয়নি।

সূত্র জানায়, গত বছরের নভেম্বর থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত ছয় মাসে পর্ষদের ১৩ সদস্যকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তবে ওই সময়ের পর্ষদের সদস্য সচিব ও সাবেক এমডি কাজী ফখরুল ইসলাম পলাতক থাকায় তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা সম্ভব হয়নি। সূত্র জানিয়েছে, এখন দুদক পরিচালক সৈয়দ ইকবাল হোসেনের নেতৃত্বে বিশেষ তদন্ত টিমের সদস্যরা একই দিনে এক টেবিলে বসিয়ে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করবেন। এ লক্ষ্যে কমিশনের অনুমতি চাওয়া হয়েছে। অনুমোদন পাওয়ার পর সাবেক ১৩ পরিচালককে ডাকা হবে। কমিশন-সংশ্নিষ্ট একটি সূত্র জানায়, দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের নিখুঁতভাবে চিহ্নিত করতে তদন্ত কর্মকর্তাদের যা যা করা দরকার, তার সবই করতে সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।

দুদক জানায়, ত্রুটিপূর্ণ ঋণ প্রস্তাবগুলোতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরোর (সিআইবি) ক্লিয়ারেন্স (ছাড়পত্র) ছিল না। প্রস্তাবে উল্লেখ করা জামানতের মূল্য যাচাই করা হয়নি। ঋণগ্রহীতার ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা, ঋণের টাকা ফেরত দেওয়ার সক্ষমতা আছে কি-না- তা মূল্যায়ন করা হয়নি। অধিকাংশ ঋণগ্রহীতার কোনো ব্যবসা নেই। কারও কারও ছোট্ট পরিসরে ব্যবসা থাকলেও ৫০, ৮০, ১শ’ কোটি টাকার ঋণ ফেরত দেওয়ার সক্ষমতা নেই। ঋণ প্রস্তাবগুলোতে শাখা থেকে এসব তথ্য উল্লেখ করা হলেও পরিচালনা পর্ষদ প্রস্তাবগুলো বাতিল না করে অনুমোদন দিয়েছিল।

ব্যাংকের আইন লঙ্ঘন করে জালিয়াতির মাধ্যমে ঋণের নামে সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের সব তথ্য-প্রমাণ দুদকের প্রতিবেদনে তুলে ধরা হবে। আত্মসাতের উদ্দেশ্যে জালিয়াতপূর্ণ ঋণ প্রস্তাবগুলো কীভাবে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, পর্ষদের সাবেক এই ১৩ পরিচালকের কাছে এর জবাব চাওয়া হবে। তারা বাচ্চুর নেতৃত্বে ২০০৯-১৪ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত দুই মেয়াদে পর্ষদের দায়িত্ব পালন করেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুদকের এক পদস্থ কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, জালিয়াতি করে ঋণের নামে ব্যাংকটির সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের দায় পর্ষদ সদস্যরা এড়াতে পারেন না। ওই পর্ষদই একের পর এক জালিয়াতিপূর্ণ ঋণ প্রস্তাবের অনুমোদন দিয়ে ব্যাংক থেকে টাকা বের করে দিয়েছেন।

পর্ষদের সাবেক ১৩ সদস্যের মধ্যে সাবেক চেয়ারম্যান বাচ্চুকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় গত বছরের ৪ ও ৫ ডিসেম্বর। এর আগে একই বছরের ২২ নভেম্বর সচিবালয়ে ডাক, তার ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সচিব (সাবেক পর্ষদ সদস্য) শ্যাম সুন্দর সিকদার ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও অর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (সাবেক পর্ষদ সদস্য) কামরুন্নাহার আহমেদকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। রাজধানীর সেগুনবাগিচায় দুদকের প্রধান কার্যালয়ে অধ্যাপক কাজী আখতার হোসেন ও ফখরুল ইসলামকে ২৩ ডিসেম্বর, সাখাওয়াত হোসেনকে ২৭ নভেম্বর, জাহাঙ্গীর আকন্দ সেলিম ও একেএম কামরুল ইসলামকে (এফসিএ) ২৮ নভেম্বর, আনোয়ারুল ইসলাম (এফসিএমএ) ও আনিস আহমেদকে ২৯ নভেম্বর এবং একেএম রেজাউর রহমানকে ৩০ নভেম্বর জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

গত মাসের শেষ দিকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় বাণিজ্য সচিব (সাবেক পর্ষদ সদস্য) শুভাশীষ বোস ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মহাপরিচালক (সাবেক পর্ষদ সদস্য) নিলুফার আহমেদকে। বাচ্চুকে চলতি বছরেও কয়েক দফা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

গত বছরের শেষ দিকে দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ সমকালকে বলেছিলেন, ক্রেডিট কমিটির আপত্তি থাকা সত্ত্বেও ব্যাংকটির তৎকালীন পরিচালনা পর্ষদ ঋণ প্রস্তাবগুলো কীভাবে অনুমোদন দিয়েছিল- তদন্তের ক্ষেত্রে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তদন্ত কর্মকর্তারা মনে করলে ওই সময়ের বোর্ড সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারবেন। এ ব্যাপারে তদন্ত কর্মকর্তাদের চিঠি দেওয়া হয়েছে। কমিশনের ওই চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে দুদক পরিচালক ইকবাল হোসেনের নেতৃত্বে বিশেষ টিম পর্যায়ক্রমে পর্ষদ সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদ করেছে।

দুদক চেয়ারম্যান আরও বলেন, লোপাট হওয়া টাকা কোথায়, কার কাছে গেল- এসব তথ্য আদালতে পেশ করতে হবে। না হলে ৫৬ মামলার অভিযোগ প্রমাণ করা যাবে না। ওইসব তথ্য সংগ্রহের জন্য চার্জশিট পেশ করতে দেরি হচ্ছে। সূত্র জানায়, রাষ্ট্রায়ত্ত বেসিক ব্যাংকের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে ২০১৫ সালের ২১-২৩ সেপ্টেম্বর করা দুদকের ৫৬টি মামলায় বাচ্চু ও পর্ষদের কোনো সদস্যকেই আসামি করা হয়নি। গত আড়াই বছর ধরে মামলাগুলোর তদন্তই চলছে। আদালতে কখন চার্জশিট পেশ করা হবে এ নিয়ে সুস্পষ্টভাবে কেউ কোনো কথা বলছেন না।

গত ১৭ আগস্টের শুনানির পর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ থেকে দুদকের কাছে পাঠানো এক আদেশে বেসিক ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান বাচ্চুসহ ওই সময়কার পর্ষদ সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত করে তদন্ত সম্পন্ন করে প্রতিবেদন পেশের কথা বলা হয়েছিল। যা এখনও শেষ হয়নি।

দুদক সূত্রে জানা গেছে, ২০১৫ সালের ২১-২৩ সেপ্টেম্বর ব্যাংকের ২ হাজার ৩৬ কোটি ৬৫ লাখ ৯৪ হাজার ৩৪১ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ঢাকার গুলশান, পল্টন ও মতিঝিল থানায় ৫৬টি মামলা করে দুদক। বিপুল অঙ্কের এসব ঋণ প্রস্তাবের সবগুলোই ছিল ত্রুটিপূর্ণ।

বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারি নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বেসিক ব্যাংকের বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। পরে ২০১৩ সালের মার্চ পর্যন্ত বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৯ হাজার ৩৭৩ কোটি টাকা। ওই চার বছর তিন মাসে ব্যাংক থেকে মোট ৬ হাজার ৬৭৩ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়, যার সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকাই নিয়ম ভঙ্গ করে দেওয়া হয়। এর মধ্যে ২ হাজার ৩৬ কোটি ৬৫ লাখ ৯৪ হাজার ৩৪১ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দুদক ৫৬টি মামলা করে। বাকি ২ হাজার ৪৬৩ কোটি ৩৪ লাখ ৫ হাজার ৬৫৯ টাকা আত্মসাতের অনুসন্ধান শুরু করা হয়নি। ৫৬টি মামলায় ব্যাংকের সাবেক এমডি কাজী ফখরুল ইসলামসহ মোট ১২০ জনকে আসামি করা হয়।

Leave a Reply