ক্রীড়াঙ্গন

বোলিংয়ে সবার ওপরে মাশরাফি

শেরে বাংলায় যে সব পিচে খেলা হয়েছে, তা যে আদর্শ টি-টোয়েন্টি উইকেট নয়, তা নতুন করে বলার দরকার নেই। দেশি-বিদেশি ক্রিকেটার ও কোচ- সবাই প্রায় এক বাক্যেই বলছেন, ডাবল পেসড উইকেট। বল কখনো থেমে আসছে। আবার কোন সময় ঠিক গতিতে ব্যাটে আসছে। বাউন্সও তুলনামূলক কম। বল একটু দেরিতে আসায় ব্যাটসম্যানদের স্বচ্ছন্দে খেলাই দায়। বিগ হিটে চার ও ছক্কার প্রদর্শনী ঘটানোও বেশ কঠিন। প্রায়ই টাইমিংয়ের হেরফের হচ্ছে। যে কারণে আক্রমণাত্মক ও ঝড়ো উইলোবাজির দেখা মিলেছে কম।

ভাবা হচ্ছে সিলেটে স্পোর্টিং পিচে ব্যাটসমানদের জন্য সহায়ক হবে। সিলেটের লাল মাটির উইকেট তুলনামূলক দ্রুত গতির। বাউন্সটা শেরে বাংলার কালো মাটির পিচের চেয়ে বেশী থাকে। সেই ধারা অব্যাহত থাকলে হয়ত বিপিএলের সিলেট পর্ব জমে উঠবে। রান উৎসবে মেতে উঠবেন ব্যাটসম্যানরা। বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের ব্যাটও জ্বলে উঠবে।

তারপরও ঢাকার মরা পিচে আফগান রিক্রুট হযরতউল্লাহ জাজাই, রংপুর রাইডার্সের দক্ষিণ আফ্রিকান রিলে রুশো, সিলেট সিক্সার্সের ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান রিক্রুট নিকোলাস পুরান এবং শ্রীলঙ্কার থিসারা পেরেরা আর বাংলাদেশের মুশফিকুর রহিম ঝড়ে ব্যাটিং করেছেন।

শুধু তারকা ব্যাটসম্যানরাই নন, এক কথায় এবারের বিপিএলে বাংলাদেশের উইলোবাজরা এখনো সেভাবে জ্বলে উঠতে পারেননি। হাতে গোনা কজন ছাড়া বড় অংশ ব্যর্থতার মিছিল করছেন। তবে ব্যাটসম্যানদের হতাশাজনক পারফরম্যান্সের বিপরীতে রয়েছেন বোলাররা।

এক কথায় এখন পর্যন্ত দেশি ক্রিকেটারদের মান রেখেছেন বোলাররাই। দেশি বোলারদের মধ্যে সবচেয়ে উজ্জ্বল মাশরাফি বিন মর্তুজা। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অত্যন্ত সক্রিয় থেকে নড়াইলের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত ছুটে বেড়ানো এবং বাড়ি-বাড়ি নির্বাচনি প্রচার শেষে বিপুল ভোটে বিজয়ী মাশরাফি ‘এমপি’ তকমা গায়ে মেখে মাঠে নেমেও বল হাতে ঠিক আগের মতই স্বপ্রতিভ, উজ্জ্বল ও কার্যকর। এখন পর্যন্ত বিপিএলে উইকেট শিকারে সবার ওপরে মাশরাফি বিন মর্তুজা।

নিজের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে উইকেটের চরিত্র, গতি-প্রকৃতি জেনে এবং প্রতিপক্ষ ব্যাটসম্যানের মনোভাব বুঝে ঠিক লাইন ও লেন্থে বল ফেলে সবচেয়ে সফল মাশরাফি। সর্বাধিক সমীহও আদায় করে নিয়েছেন।

রংপুর রাইডার্স অধিনায়ক এখন পর্যন্ত ৫ খেলায় ২০ ওভার বোলিং করে পেয়েছেন ১০ উইকেট। সেরা বোলিং ৪/১১, ওভার পিছু রান খরচা ৫.৭০ করে। ৯ উইকেট শিকার করে যৌথভাবে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছেন দুজন- চিটাগাং ভইকিংসের ৩৪ বছর বয়সী দক্ষিণ আফ্রিকান ফাস্ট মিডিয়াম বোলার রবি ফ্রাইলিঙ্ক আর খুলনা টাইটান্সের পেসার শফিউল ।

এখন পর্যন্ত ম্যাচ পিছু বোলিংকে মানদণ্ড ধরলে শফিউল বেশ সমীহ জাগানো বোলিং করেছেন। ভাইটাল ব্রেক থ্রু এনে দিয়েছেন। অগের সেই গতিতে বল করতে না পারলেও সুইংটা ঠিকই পেয়েছেন শফিউল।

ফ্রাইলিঙ্কের সেরা বোলিং ফিগার ৪/১৪ আর শফিউলের সেরা ম্যাচ ফিগার ৩/৩৫। মাশরাফির চেয়ে একটু পিছনে থাকলেও মোটামুটি ধারাবাহিকভাবে ভাল বোলিং করেছেন সাকিব আল হাসানও। একক ভাবে না হলেও ঢাকা ডায়নামাইটস অধিনায়ক ও বাঁহাতি স্পিনার সাকিব, সিলেট সিক্সার্সের তাসকিন আহমেদ আর কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্সের সাইফউদ্দীন প্রত্যেকে ৭ উইকেট করে পেয়ে যৌথভাবে উইকেট প্রাপ্তিতে তিন নম্বরে।

মাঝে নিজেকে হারিয়ে ফেলা তাসকিন আহমেদ এবার আবার ছন্দ ফিরে পেয়েছেন। শেষ দুই ম্যাচে তাসকিন বেশ ভাল বোলিং করেছেন। তার বলে গতি ও ম্যুভমেন্ট দুই-ই চোখে পড়েছে। এছাড়া আরেক পেসার রুবেল হোসেনও মোটামুটি ফর্মে আছেন।

রংপুর রাইডার্সের ফরহাদ রেজা ও চিটাগাং ভাইকিংসের খালেদ আহমেদের সাথে সমান ৬ উইকেট করে পেয়ে উইকেট প্রাপ্তিতে যৌথভাবে চার নম্বরে। এর পর পরই আছেন ঢাকার তিন অফস্পিনার সুনিল নারিন, শুভাগত হোম আর আলিস আল ইসলাম এবং কুমিল্লার লেগস্পিনার শহীদ আফ্রিদি। এই চার স্পিনারও সমান ৫ উইকেট করে দখল করেছেন।

তবে সে তুলনায় অনুজ্জ্বল কাটার মাস্টার মোস্তাফিজ। জাতীয় দলে জায়গা করে নেয়া দুই পেসার আবু হায়দার রনি, আবু জায়েদ রাহি, অফস্পিনার মেহেদি হাসান মিরাজ এবং বাঁহাতি স্পিনার নাজমুল অপুও তুলনামূলক পিছিয়ে।

এদের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থা মিরাজের। রাজশাহী কিংসকে নেতৃত্ব দেয়া মিরাজ ব্যাট হাতে বেশ নজর কাড়ছেন। নিয়মিত রানও করছেন। কিন্তু তার যেটা মূল কাজ, সেই বোলিংয়ে সুবিধা করতে পারেননি। চার খেলায় উইকেট পেয়েছেন মাত্র দুটি। প্রায় একই অবস্থা মোস্তাফিজের। রাজশাহী কিংসের পক্ষে খেলা বাঁহাতি মোস্তাফিজের ঝুলিতে এখন পর্যন্ত জমা পড়েছে মাত্র ৩ উইকেট ( চার খেলায়)।

অন্যদিকে বাঁহাতি রংপুর রাইডার্সের বাঁহাতি স্পিনার নাজমুল অপুর উইকেট সংখ্যা ৪ (পাঁচ খেলায়)। চিটাগাং ভাইকিংসের হয়ে খেলা পেসার আবু জায়েদ রাহিরও উইকেট ৪ টি (পাঁচ খেলায়)। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্সের পক্ষে সব কয়টা ম্যাচ খেলা বাঁহাতি পেসার আবু হায়দার রনিও পেয়েছেন তিন উইকেট।

এছাড়া দুই বাঁহাতি তাইজুল ইসলাম আর সানজামুল ইসলামও তেমন সুবিধা করতে পারেননি। খুলনার পক্ষে খেলা তাইজুল আর চিটাগাং কিংসের সানজামুল দুজনই চার খেলায় মাত্র ২ উইকেট করে পেয়েছেন। জাতীয় দলের বাইরে থাকাদের মধ্যে আরাফাত সানি (চার খেলায় ৩) , পেসার মোহাম্মদ শহিদ (তিন খেলায় ২) আর পেসার আল আমিন হোসেন (তিন খেলায় ৩), অফস্পিনার সোহাগ গাজী (পাঁচ খেলায় ৩) এবং কামরুল ইসলাম রাব্বির (এক খেলায় ২) কেউই ভাল বোলিং করতে পারেননি।

বোলিং অ্যাকশন প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ায় তাকে নিয়ে কথা বার্তা কম, তবে উইকেট প্রাপ্তির মানদণ্ডে নতুন বোলারদের মধ্যে ঢাকার অফস্পিনার আলিস আল ইসলামই প্রথম পর্বে নজর কেড়েছেন। জীবনের প্রথম খেলতে নেমে চ্যাম্পিয়ন রংপুর রাইডার্সের বিপক্ষে অনবদ্য হ্যাটট্রিকও করেছেন রাজধানীর অদুরে সাভারের বলিয়ারপুরের এ ২৩ বছর বয়সী অফস্পিনার। ২ ম্যাচে শিকার করেছেন ৫টি উইকেট।