জাতীয়

শেখ হাসিনার নেতৃত্বে নতুন সরকারের যাত্রা শুরু

ঘড়ির কাঁটায় বিকেল তিনটা বেজে ৩০ মিনিট। বঙ্গভবনের দরবার হল কানায় কানায় পূর্ণ। বেজে উঠলো বিউগলের সুর, রাষ্ট্রপতির আগমন বার্তা। রাষ্ট্রপতির আসন গ্রহণ। তারপর জাতীয় সংগীতের সুরে অভূতপূর্ব পরিবেশ। শপথগ্রহণ শেষে সূচনা হলো আওয়ামী লীগ সরকারের নবযাত্রা। টানা দুই মেয়াদ শেষ করে ২১ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকা শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের তৃতীয় মেয়াদের যাত্রা।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসাবে পুনরায় শপথ নিয়েছেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। এর আগে টানা দু’বার এবং ১৯৯৬ সালে আরো একবার তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ নিয়ে চতুর্থবারের মতো তিনি প্রধানমন্ত্রী হলেন। একই সময়ে ২৪ জন মন্ত্রী , ১৯ জন প্রতিমন্ত্রী ও ৩ জন উপমন্ত্রী পৃথকভাবে শপথ গ্রহণ করেন। বঙ্গভবনের দরবার হলে অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ শপথ বাক্য পাঠ করান। শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম।

প্রধানমন্ত্রী শপথ নেওয়ার পর রাষ্ট্রপতি তাকে অভিনন্দন জানান। শেখ হাসিনা শপথ নেওয়ার পর ছোট বোন শেখ রেহানা তাকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান। এ সময় শেখ হাসিনা তার বোন শেখ রেহানাকে জড়িয়ে ধরে আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন। আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য সাজেদা চৌধুরী দলের সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বুকে জড়িয়ে নেন। পরে হাত নেড়ে উপস্থিত সবাইকে শুভেচ্ছা জানিয়ে আসন গ্রহণ করেন শেখ হাসিনা।

শেখ রেহানা ছাড়াও তার ছেলে রেদওয়ান মুজিব সিদ্দিক সস্ত্রীক এসেছিলেন নতুন মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠানে। প্রধানমন্ত্রীর চাচাতো ভাই সংসদ সদস্য শেখ হেলাল উদ্দিন ও শেখ সালাউদ্দিন জুয়েলও শপথ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী, প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, সিইসি কে এম নূরুল হুদা এবং সংসদ সদস্য, দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ, তিন বাহিনীর প্রধান, আইজিপিসহ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের প্রতিনিধিরা নতুন সরকারের অভিষেকে উপস্থিত ছিলেন।

একাদশ সংসদের প্রধান বিরোধী দলের আসনে বসার সিদ্ধান্ত নেওয়া জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বা তার স্ত্রী গত সংসদের প্রধান বিরোধী দলীয় নেতা রওশন এরশাদকে নতুন সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে দেখা যায়নি।

তবে জোট শরিকদের মধ্যে ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন, বিকল্প ধারার প্রেসিডেন্ট এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী, মহাসচিব আবদুল মান্নান ও যুগ্ম মহাসচিব মাহি বি চৌধুরী এবং জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য ফখরুল ইমাম উপস্থিত ছিলেন দরবার হলে। মন্ত্রিসভায় স্থান না পাওয়া আওয়ামী লীগ নেতাদের মধ্যে আবুল মাল আবদুল মুহিত, এ এইচ মাহমুদ আলী, আমির হোসেন আমু, মতিয়া চৌধুরী, তোফায়েল আহমেদ, নুরুল ইসলাম নাহিদ, কামরুল ইসলাম, শামসুর রহমান শরীফ শপথ অনুষ্ঠানে ছিলেন। গত সরকারে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম, তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী ও গওহর রেজভীও ছিলেন বঙ্গভবনে।

শপথ অনুষ্ঠান শেষে বঙ্গভবনের মাঠে চা চক্রে যোগ দেন সবাই। রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেখানে ঘুরে ঘুরে সবার সঙ্গে কথা বলেন। নতুন মন্ত্রিসভা শপথ নেওয়ায় ২০১৪ সালের ১২ জানুয়ারি গঠিত পুরনো সরকারের দায়িত্ব শেষ হল।

আজ মঙ্গলবার সকাল দশটায় মন্ত্রিসভার সদস্যবৃন্দ ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদনের পর সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাবেন।

মন্ত্রিপরিষদের সদস্য যারা শপথ নিলেন

মন্ত্রী: মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়: আ ক ম মোজাম্মেল হক, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়: ওবায়দুল কাদের, কৃষি মন্ত্রণালয়: আবদুর রাজ্জাক, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়: আসাদুজ্জামান খান কামাল, তথ্য মন্ত্রণালয়: হাছান মাহমুদ, আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়: আনিসুল হক, অর্থ মন্ত্রণালয়: আ হ ম মুস্তফা কামাল, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়: তাজুল ইসলাম, শিক্ষা মন্ত্রণালয়: দীপু মনি, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়: এ কে আবদুল মোমেন, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়: এম এ মান্নান, শিল্প মন্ত্রণালয়: নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুন, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়: গোলাম দস্তগীর গাজী, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়: জাহিদ মালেক, খাদ্য মন্ত্রণালয়: সাধন চন্দ্র মজুমদার, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়: টিপু মুনশি, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়: নুরুজ্জামান আহমেদ, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়: শ ম রেজাউল করিম, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু মন্ত্রণালয়: শাহাব উদ্দিন, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়: বীর বাহাদুর উ শৈ সিং, ভূমি মন্ত্রণালয়: সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ, রেলপথ মন্ত্রণালয়: নুরুল ইসলাম সুজন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়: ইয়াফেস ওসমান (টেকনোক্রেট), ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়: মোস্তাফা জব্বার (টেকনোক্রেট)

প্রতিমন্ত্রী:

শিল্প মন্ত্রণালয়: কামাল আহমেদ মজুমদার, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়: ইমরান আহমেদ চৌধুরী, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়: জাহিদ আহসান রাসেল, বিদ্যুত্, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়: নসরুল হামিদ বিপু, মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়: আশরাফ আলী খান খসরু, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়: মুন্নুজান সুফিয়ান, নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়: খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়: জাকির হোসেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়: শাহরিয়ার আলম, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়: জুনাইদ আহমেদ পলক, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়: ফরহাদ হোসেন, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়: স্বপন ভট্টাচার্য্য, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়: জাহিদ ফারুক, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়: মুরাদ হাসান, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়: শরীফ আহমেদ, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়: কে এম খালিদ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়: এনামুর রহমান, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়: মাহবুব আলী, ধর্ম বিষয় মন্ত্রণালয়ে শেখ মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ ( টেকনোক্রেট)

উপমন্ত্রী:

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ে হাবিবুন নাহার, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে এ কে এম এনামুল হক শামীম, শিক্ষা মন্ত্রণালয় মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল।

চীন ও নেপালের

প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন

বাসস জানায়, চীনের প্রধানমন্ত্রী লী কেকিয়াং ও নেপালের খার্গো প্রসাদ শর্মা ওলি টানা তৃতীয় মেয়াদের জন্য প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শপথ গ্রহণ করায় আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাকে আন্তরিক অভিনন্দন জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম বাসসকে জানান, ‘চীনের প্রধানমন্ত্রী অভিনন্দন জানিয়ে একটি বার্তা পাঠিয়েছেন’। তিনি বলেন, বার্তায় চীনের প্রধানমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন যে, আগামী দিনগুলোতে দু’দেশের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ও সহযোগিতা আরো জোদার হবে। লী কেকিয়াং প্রধানমন্ত্রী শেষ হাসিনার সাফল্য এবং বাংলাদেশের অব্যাহত শান্তি, অগ্রগতি ও সমৃদ্ধি কামনা করেন।

প্রেস সচিব জানান, নেপালের প্রধানমন্ত্রী খার্গো প্রসাদ শর্মা ওলিও টানা তৃতীয় মেয়াদের জন্য প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শপথ গ্রহণ করায় আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে গাঠনো অভিনন্দন বার্তায় নেপালের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাফল্য এবং বাংলাদেশের অব্যাহত শান্তি, অগ্রগতি ও সমৃদ্ধি কামনা করেন।

বুধবার টুঙ্গিপাড়া যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী

গোপালগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, রেকর্ড চতুর্থবার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের পর বুধবার জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধিতে শ্রদ্ধা জানাতে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রী এ দিন সকাল ১১টায় বঙ্গবন্ধুর সমাধিসৌধের বেদীতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন। পরে ফাতেহাপাঠ ও তাঁর পিতার রুহের মাগফিরাত কামনায় দোয়া মোনাজাতে অংশ নেবেন।

আরও পড়ুনঃ নতুন মজুরি কাঠামো পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত

প্রধানমন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিব-১ কাজী নিশাত রসুল স্বাক্ষরিত গোপালগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মোখলেসুর রহমান সরকারের কাছে পাঠানো এক ফ্যাক্স বার্তায় এ তথ্য জানা গেছে।