রাজনীতি

চূড়ান্ত মনোনীতদের চিঠি দিয়েছে আওয়ামী লীগ

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের আসন ভাগাভাগি সম্পন্ন হয়েছে। গতকাল শুক্রবার চূড়ান্ত মনোনিতদের চিঠি দিয়েছে আওয়ামী লীগ। ৩০০ আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ নিয়েছে ২৪০টি। ৬০ আসন শরিকদের দেওয়া হয়েছে। জোটের প্রধান শরিক জাতীয় পার্টি (জাপা) পেয়েছে ৩৭টি আসন। তবে ৭টি আসন উন্মুক্ত রায়েছে। জাপার পাশাপাশি আওয়ামী লীগের প্রার্থীরাও এই সাত আসনে লড়বেন। যে কোন সময় এই সাত আসনেও সমঝোতা হতে পারে।

যদিও গতকাল ওবায়দুল কাদের বলেছেন, জাপাকে ৪২ থেকে ৪৪টি আসন দেওয়া হয়েছে। এদিকে আসন ভাগাভাগিতে ১৪ দলীয় জোটের শরিকদের ১৩টি আসন দেওয়া হয়েছে। একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন যুক্তফ্রন্ট ৩ আসনে লড়বেন। ওয়ার্কার্স পার্টি ৫, হাসানুল হক ইনুর নেতৃত্বাধীন জাসদ ৩, জাতীয় পার্টির (জেপি) ২, তরিকত ফেডারেশন ২ এবং বাংলাদেশ জাসদের ১টি আসন পেয়েছে। মহাজোটের মধ্যে জাপা লাঙ্গল প্রতীকে প্রতীকে নির্বাচন করবে। ১৪ দলীয় জোট শরিক ও মহাজোট শরিক যুক্তফ্রন্ট নৌকা বা নিজস্ব দলীয় প্রতীকে নির্বাচন করার সুযোগ পাচ্ছেন।

এদিকে দুইজন করে মনোনয়ন দেওয়া ১৭টি আসনেও একক প্রার্থীর চূড়ান্ত মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে চাঁদপুর-২ আসনে বাদ পড়েছেন ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বীরবিক্রম। তার বদলে এ আসনে আওয়ামী লীগের চূড়ান্ত মনোনয়ন পেয়েছেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি নুরুল আমিন খান রুহুল। নির্বাচন কমিশনের যাচাইয়ে দুই জনই বৈধ প্রার্থী হন। চাঁদপুর-৪ আসনে ড. মোহাম্মদ শামছুল হক ভূঁইয়া বাদ পড়েছেন। এ আসনে মনোনয়ন পেয়েছেন জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি মুহম্মদ শফিকুর রহমান। কিশোরগঞ্জ-১ আসনে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বহাল আছেন। এখন ৩০০ আসনেই মহাজোটের চূড়ান্ত একক প্রার্থী। মহাজোটের আসন ভাগাভাগির বিষয়টি আজ শনিবার নির্বাচন কমিশনে গিয়ে লিখিত আকারে জানিয়ে দিবে আওয়ামী লীগ। একই সঙ্গে আজ মহাজোটের শরিক জাপার ৪২ আসনের প্রার্থীর নামও ঘোষণা করা হবে।

অপরদিকে জোট শরিকদের মধ্যে যারা নৌকা প্রতীকে নির্বাচন করবেন তাদের কাছে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা স্বাক্ষরিত চূড়ান্ত মনোনিত হওয়ার চিঠি দেওয়া হয়েছে। গতকাল ধানমন্ডিস্থ আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর রাজনৈতিক কার্যালয়ে সংশ্লিস্টদের কাছে এ চিঠি হস্তান্তর করেন দলের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। ১৪ দলীয় জোট ও মহাজোটের শরিক দলগুলোর প্রার্থীদের মধ্যে যারা নৌকা প্রতীকে নির্বাচন করবেন তাদের হাতেও চিঠি দেওয়া হয়েছে। ১৪ দলীয় জোটগতভাবে পিরোজপুর-২ আসনে নির্বাচন করবেন জাতীয় পার্টির (জেপি) চেয়ারম্যান ও পানি সম্পদ মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু। তার নির্বাচনী প্রতীক ‘বাইসাইকেল’। আসন ভাগাভাগিতে জেপি পেয়েছে আরেকটি আসন। জেপি’র মোঃ রুহুল আমিন কুড়িগ্রাম-৪ আসনে নৌকা প্রতীকে নির্বাচন করবেন। এছাড়া ১৪ দলীয় জোটের শরিকদের মধ্যে যারা নৌকা প্রতীকে নির্বাচন করবেন তারা হলেন, ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি ও সমাজ কল্যাণ মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন (ঢাকা-৮), ফজলে হোসেন বাদশা (রাজশাহী-২), মোস্তফা লুত্ফুল্লাহ (সাতক্ষীরা-১), মো. ইয়াসিন আলী (ঠাকুরগাঁও-৩), টিপু সুলতান (বরিশাল-৩), জাসদ সভাপতি ও তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু (কুষ্টিয়া-২), বেগম শিরীন আখতার (ফেনী-১), রেজাউল করিম তানসেন (বগুড়া-৪), বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশনের সৈয়দ নজিবুল বশর মাইজভান্ডারী (চট্টগ্রাম-২), আনোয়ার খান (লক্ষীপুর-১) ও বাংলাদেশ জাসদের (আম্বিয়া) মইন উদ্দীন খান বাদল (চট্টগ্রাম-৮)। নড়াইল-১ আসনে কবিরুল হকের পাশাপাশি বাংলাদেশ জাসদের সভাপতি শরীফ নুরুল আম্বিয়াকে মনোনয়ন দিয়েছিল আওয়ামী লীগ। তবে চূড়ান্ত মনোনয়নে শরীফ নুরুল আম্বিয়া বাদ পড়েছেন। এছাড়া ১৪ দলীয় জোটের মধ্যে বাদ পড়েছেন জাসদের নাজমুল হক প্রধান। তিনি পঞ্চগড়- ১ আসনের বর্তমান এমপি। আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য, কেন্দ্রীয় ১৪ দলের মুখপাত্র এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম জানান, ‘একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আসন বণ্টনে ১৪ দল সন্তুষ্ট। ১৪ দল ঐক্যবদ্ধ আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। আগামী ১১ ডিসেম্বর থেকে ১৪ দল জোটগতভাবে পূর্বঘোষিত নির্বাচনী প্রচারনায় নামবে।

মহাজোটের শরিক যুক্তফ্রন্ট পেয়েছে তিনটি আসন। যুক্তফ্রন্টের মেজর (অব.) এমএ মান্নান (লক্ষ্মীপুর-৪), মাহী বি চৌধুরী (মুন্সীগঞ্জ-১) ও এফএম শাহীন (মৌলভীবাজার-২)। নৌকা প্রতীকে তারা নির্বাচন করবেন। অপরদিকে যারা নিজস্ব দলীয় প্রতীকে নির্বাচন করবেন তাদেরও চিঠি দিয়ে কয়টি আসন দেওয়া হয়েছে তা জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে ১৪ দলীয় জোট ও যুক্তফ্রন্টের ১৬ জন নেতা নৌকা প্রতীকে নির্বাচন করার সুযোগ পেয়েছেন। তবে এই ১৬ জনের কেউ চাইলে নিজস্ব দলীয় প্রতীকেও নির্বাচন করতে পারবেন। তবে যে প্রতীকেই দাঁড়ানো হোক না এই ১৬ আসনে উল্লিখিত ১৬ জনই মহাজোটের একক প্রার্থী। আর জাতীয় পার্টির (জাপা) লাঙ্গল প্রতীকে নির্বাচন করবে।

চিঠি প্রদান শেষে আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও দলের সংসদীয় বোর্ডের চেয়ারম্যান শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ইতিমধ্যে দলের এবং জোটের মনোনয়ন প্রক্রিয়া শেষ করেছি, যারা চূড়ান্ত মনোনয়ন পেয়েছেন তাদের চিঠি দেয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগ থেকে জোটের শরিকদের জন্য ৫৫ থেকে ৬০টি আসন ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে জাতীয় পার্টি (জাপা) পাচ্ছে ৪২ থেকে ৪৪টি আসন। তিনি বলেন, এবার ১৭টি আসনে ডাবল প্রার্থী ছিল, আমরা সিঙ্গেল করে নিয়ে এসেছি। বেশিরভাগই চিঠি দিয়ে দেয়া হয়েছে। যারা যারা বাকি আছেন তারা নিয়ে যাবেন, জাহাঙ্গীর কবির নানক সাহেবের কাছে থাকবে।’

জানা গেছে, ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচন থেকে শেষ মুহূর্তে সরে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছে আওয়ামী লীগ। এ কারণে কিছুটা কৌশল গ্রহণ করেছে আওয়ামী লীগ। মহাজোটের আসন ভাগাভাগি চূড়ান্ত হলেও অন্য আসনগুলোতে প্রার্থী দেওয়ার জন্য শরিকদের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে ওবায়দুল কাদের বলেন, শরিক দলগুলো আরও বেশি আসন প্রত্যাশা করে। তবে আওয়ামী লীগ নৌকা প্রতীকে এর বেশি মনোনয়ন দিতে পারছে না। শরিক দলগুলো চাইলে অন্য আসনেও নিজেদের প্রতীকে প্রার্থী দিতে পারেন। তিনি বলেন, ‘কারা মনোনায়ন পেলেন এ তালিকা আজ নির্বাচন কমিশনে জমা দেব। তখন মহাজোটের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হবে।’ আরেক প্রশ্নের জবাবে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘আওয়ামী লীগের মোটামুটি ২৪০ জন প্রার্থী চূড়ান্ত। তবে দুই-একজন এদিক-ওদিক হতে পারে। জয়ী হতে পারে এমন প্রার্থী দেখেই আমরা মনোনয়ন দিয়েছি। বাকি যে ২-৪টি আসন এখনো অমীমাংসিত আছে, রাতেই এর সমাধান হয়ে যাবে।’

ওবায়দুল কাদের বলেন, আমাদের শরিকরা ইচ্ছে করলে নিজেদের প্রতীকে আরো বেশি আসনে নির্বাচন করতে পারবেন। শরিক দলের নিজেদের শক্তিমত্তার পরিচয় জানান দিতে তাদেরও সুযোগ দিয়েছি। এ সময় পাশে বসা বিকল্পধারার মহাসচিব নিচু স্বরে আরো আসনের বিষয়ে বলতে চাইলে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘মান্নান ভাই আপনি চাইলে কুলা মার্কায় আরো প্রার্থী দিতে পারেন। আমরা তিনটার বেশি দিতে পারবো না। শ্রদ্ধেয় বদরুদ্দোজা চৌধুরী সাহেবের সাথে আমাদের নেত্রী আলাপ করবেন। আমি জানি আপনাদের আরো প্রার্থীর প্রত্যাশা আছে। তবে আমরা নৌকা প্রতীকে এর বেশি দিতে পারব না। আমাদের অন্য শরিকরা সবাই একমত হয়েছেন, আশা করি আপনিও একমত হবেন।’ ওবায়দুল কাদের বলেন, আমরা উন্মুক্ত করে দিয়েছি বিকল্পধারা চাইলে কুলা মার্কায় নির্বাচন করবে, জাসদ মশাল মার্কা, তরিকত ফুলের মালা মার্কায় তাদের প্রার্থী দিয়ে নির্বাচন করতে পারবে। তবে আমরা যাদের নৌকা প্রতীক দিয়েছি তাদের চূড়ান্ত তালিকা এটাই। আমরা দফায় দফায় আলাপ-আলোচনা করে দলের এবং জোটের মনোনয়ন চূড়ান্ত করেছি। শনিবার আমাদের সভানেত্রীর স্বাক্ষর সংবলিত তালিকা নির্বাচন কমিশনে পাঠিয়ে দেবো। সেখান থেকে আওয়ামী লীগের কে কোথায় ভোট করছেন, তার তালিকা পাওয়া যাবে। জাতীয় পার্টির (জাপা) চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদের বিষয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ওবায়দুল কাদের বলেন, আমি তার সঙ্গে কথা বলে জানাবো, তার আসলে কী সমস্যা। আমাদের শরিকদের মাঝে মান-অভিমান হবে, আবার একসাথে নির্বাচন করব।

একাধিক মনোনয়ন দেওয়া ১৭ আসনে চূড়ান্ত প্রার্থী যারা

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একই আসনে একাধিক মনোনয়ন দেয়া প্রার্থীদের মধ্য থেকে একজনের দলীয় চূড়ান্ত মনোনয়নের চিঠি দিয়েছে আওয়ামী লীগ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একটি আসনে নির্বাচন করবেন। আসনটি হলো গোপালগঞ্জ-৩। রংপুর-৬ আসনটি স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীকে ছেড়ে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। শেখ হাসিনা ও শিরীন শারমিন চৌধুরী দুজনই এই আসনে মনোনয়নপত্রই দাখিল করেন। গত নির্বাচনে এই আসন থেকে নির্বাচিত হয়েছিলেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পরে আসনটি ছেড়ে দিলে উপ-নির্বাচনে এই আসনের এমপি হন বর্তমান স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী। গতকাল স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর বাসভবনে গিয়ে তার হাতে রংপুর-৬ আসনে দলের চূড়ান্ত মনোনয়নের চিঠি তুলে দেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের।

এ ছাড়া, দুই জন করে মনোনয়ন দেওয়া আসনে চূড়ান্ত একক প্রার্থীরা হলেন সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম (কিশোরগঞ্জ-১), হাবিবুর রহমান মোল্লা (ঢাকা-৫), হাজি মোহাম্মদ সেলিম (ঢাকা-৭), আকবর হোসেন পাঠান ফারুক (ঢাকা-১৭), ড. মহিউদ্দীন খান আলমগীর (চাঁদপুর-১), নুরুল আমিন (চাঁদপুর-২), মুহম্মদ শফিকুর রহমান (চাঁদপুর-৪), এ কে এম শাহজাহান কামাল (লক্ষ্মীপুর-৩), নিজাম উদ্দিন জলিল (নওগাঁ-৫), মো. শহিদুল ইসলাম বকুল (নাটোর-১), বি এম কবিরুল হক (নড়াইল-১), ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু (বরগুনা-১), আ স ম ফিরোজ (পটুয়াখালী-২), তানভীর হাসান ওরফে ছোট মনি (টাঙ্গাইল-২), মো. মোজাফফর হোসেন (জামালপুর-৫), আবুল কালাম আজাদ (জামালপুর-১)। গতকাল অসুস্থ সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের চূড়ান্ত মনোনয়নের চিঠি নেন তার ছোট ভাই সৈয়দ আশফাকুল ইসলাম টিটু এবং সৈয়দ আশরাফের এপিএস এ কে এম সাজ্জাদ আলম শাহীন।